প্রীতম দাস::
ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ পথে বিদেশ গমন প্রতিরোধে এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে সুনামগঞ্জে এক গুরুত্বপূর্ন মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকেল ৫টায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতি ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
সভায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুঃখজনক ঘটনার উল্লেখ করে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, অদ্য সুনামগঞ্জে ১১ জন অভিবাসন প্রত্যাশীর সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সকল সহায়তার আওতায় আনা হবে। মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসনের মাধ্যমে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
তিনি উপস্থিত সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন (পিপিএম)-কে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দিয়ে বলেন, অনতিবিলম্বে অনুসন্ধান চালিয়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাথে জড়িত সকল দালালচক্র ও মানবপাচারকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন বাজার উন্মোচন প্রসঙ্গে মন্ত্রী এক যুগান্তকারী ঘোষণা দেন।
তিনি জানান, মালয়েশিয়াতে দ্রুতই নতুন করে কর্মী পাঠানো শুরু হবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে সিলেট অঞ্চল, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যাতে এ অঞ্চলের তরুণরা কোনো দালালের খপ্পরে না পড়ে সরকারি নিয়মে নিরাপদে বিদেশে যেতে পারেন। এছাড়া দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি ঘোষণা করেন, সুনামগঞ্জের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টেনিং সেন্টার) খোলা হবে, যেন স্থানীয় তরুণরা এলাকাতেই ভাষা ও কাজের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন।
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত বিষদ প্রজেক্টর প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপ ও ইতালিমুখী যাত্রার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়। উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ইতালিতে অনিয়মিতভাবে সমুদ্রপথে আগমনকারী মোট অভিবাসীদের মধ্যে শীর্ষ স্থানে ছিল বাংলাদেশ। ২০২৩ সালে ইতালি পৌঁছানো মোট অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রায় ৩১% ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক। বছরভিত্তিক সমুদ্রপথে ইতালি পৌঁছানো বাংলাদেশিদের পরিসংখ্যান মতে ২০২১ সালে প্রায় ১৫,১৮৮ জন, ২০২২ সালে প্রায় ১২,৭৭৫ জন, ২০২৩ সালে প্রায় ১৫,০০০ জন, ২০২৪ সালে প্রায় ২০,০০০ জন।
প্রেজেন্টেশনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে যাওয়া অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রায় সকলেই প্রথমে লিবিয়াকে ট্রানজিট ও রুট হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। উপাত্তে দেখানো হয়, বাংলাদেশে অবৈধপথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও মাগুরা জেলায়। মানবপাচারকারীরা প্রথমে ইউরোপে উচ্চ বেতনের চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর ভিজিট বা কাজের ভিসায় মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার দেশ হয়ে লিবিয়ার 'গেম ঘরে' নিয়ে দীর্ঘ দিন জিম্মি করে রাখে এবং পরিবারকে ভয় দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায় করে। পরিশেষে, ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে অতি ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের বা রাবারের নৌকায় ভূমধ্যসাগরে ঠেলে দেয়, যা অসংখ্য মানুষের সলিল সমাধি ঘটায়। ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার ভয়াবহতার বিপরীতে বৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার সুবিধা এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও 'প্রবাসী কার্ড'-এর আওতায় দেওয়া সরকারি সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়। প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী কর্মীর পরিবারকে বিমানবন্দর থেকেই তাৎক্ষণিক ৩৫ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান প্রদান। দেশে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে লাশ পরিবহন ও দাফনে সহায়তা দেওয়া হয়। প্রবাসী কর্মীর সর্বোচ্চ ২ জন প্রতিবন্ধী সন্তানকে ৬ বছর মেয়াদে মাসিক ২,০০০ টাকা হারে ভাতা প্রদান। পাশাপাশি সন্তানদের এসএসসি পর্যায়ে ২৭,৫০০ টাকা এবং এইচএসসি পর্যায়ে ৩৪,০০০ টাকা শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। বিএমইটি নিবন্ধিত প্রবাসীরা পাবেন বিমানবন্দরে পৃথক ইমিগ্রেশন বুথ বা Fast Track সার্ভিস, বলাকা লাউঞ্জে ২০% ছাড়, বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিটে ১০% ছাড়, পর্যটন করপোরেশনের হোটেল-মোটেলে ৪১% ছাড় এবং বৈধ চ্যানেলে পাঠানো রেমিট্যান্সে ৩.০% থেকে ৩.৫% পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা। প্রবাসীদের পরিবারের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষ ছাড়সহ আলাদা হেল্প ডেস্ক ও এনআইডি, পাসপোর্ট এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্সে অগ্রাধিকার সেবা (Priority Service)।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য ও গুরুত্বপূর্ণ মতামত পেশ করেন সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ (এমপি, সুনামগঞ্জ-৫), নুরুল ইসলাম (এমপি, সুনামগঞ্জ-৪), মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ (এমপি, সুনামগঞ্জ-৩), কামরুজ্জামান কামরুল (এমপি, সুনামগঞ্জ-১)।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো: মিজানুর রহমান চৌধুরী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোখতার আহমেদ, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো: মশিউর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো: শহিদুল ইসলাম চৌধুরী, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মো: জিললুর রহমান এবং সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন পিপিএম।
সভায় জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
অবৈধ যাত্রায় জিরো টলারেন্স, মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে অগ্রাধিকার পাবে সুনামগঞ্জ: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী
- আপলোড সময় : ২৫-০৮-২০২৬ ১১:৩৬:১৫ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৫-০৮-২০২৬ ১১:৪১:৩১ অপরাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ